কাঁচা হলুদ খেলে বাড়বে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জেনে নিন কাঁচা হলুদের দশটি উপকারিতা

কাঁচা হলুদ খেলে বাড়বে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, জেনে নিন এর উপকারিতা
source - quickanddirtytips

কাঁচা হলুদের বিশেষ কোনো পরিচয় দেওয়ার দরকার নেই। কমবেশি সবার বাড়িতেই থাকে কাঁচা হলুদ। রান্নার বা রূপচর্চা কিংবা কোনো শুভ অনুষ্ঠান যে কোনো ক্ষেত্রেই এই হলুদের ব্যবহার আমরা করে থাকি। কাঁচা হলুদে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট,অ্যান্টি ভাইরাল এবং অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল উপাদান। যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। চলুন জেনে ফেলি কাঁচা হলুদের দশটি উপকারিতার কথা যা আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


১. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি :

কাঁচা হলুদে থাকে কারকিউমিন, কারকিউমিনোয়েডস এবং এসেনশিয়াল অয়েল। কারকিউমিন রক্তে মিশে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন আপনার শরীর পুরোপুরি ভাবে গ্রহণ করতে অক্ষম। কীভাবে এর সম্পূর্ণ উপকারিতা পাওয়া যাবে? হলুদের সঙ্গে মেশান গোলমরিচ। গোলমরিচে থাকে পাইপারিন। পাইপারিন হলুদের সঙ্গে মিশলে শরীর পূর্ণাঙ্গ মাত্রায় কারকিউমিন শুষে নিতে সক্ষম হবে। সুতরাং হলুদ ও গোলমরিচ মিশিয়ে খেলে তবেই আপনি হলুদের সম্পূর্ণ লাভ নিতে পারবেন।

এই সংমিশ্রণ শক্তপোক্ত করে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। কাছে ঘেষতে পারে না মারন ভাইরাস। কাঁচা হলুদ বাজে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে আপনার হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। ডায়াবেটিস প্রতিরোধেও হলুদ-গোলমরিচের মিশ্রণ খুব উপকারি।


২. লিভারকে ভালো রাখতে :

লিভার আমাদের দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই লিভারকে পরিস্কার রাখতে কাঁচা হলুদ সাহায্য করে। হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদানগুলি যেকোনো ধরনের লিভারের রোগের চিকিৎসা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে হলুদের মধ্যে থাকা কারকিউমিন উপাদানটি লিভারকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। কারকিউমিন মুলত অ্যালকোহল যুক্ত ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়াও এর মধ্যে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল উপাদান খাদ্য থেকে হওয়া যেকোনো ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম। লিভারে জমে থাকা টক্সিন বের করতেও হলুদের গুরুত্ব অপরিসীম।


৩. হার্টের অসুখ কমাতে :

হার্টের অসুখে সারা বিশ্বে প্রতিবছর সবথেকে বেশি হওয়া রোগের মধ্যে একটি। কাঁচা হলুদে  থাকা কারকিউমিন আপনার হার্টের রোগকে প্রতিরোধ করতে বিশেষ সাহায্য করে। কারকিউমিনের প্রধান উপকারটি হল হার্টের রক্তনালীগুলির আস্তরণ এন্ডোথেলিয়ামের কার্যকারিতা উন্নতি করা। এই এন্ডোথেলিয়ামের কর্মহীনতা হল হৃদরোগের একটি প্রধান কারন।

গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ রক্তচাপের কারনে হৃদরোগের মতো সমস্যাগুলিকে প্রতিরোধ করতে পারে হলুদ। এছাড়া হলুদ দেহে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত কাঁচা হলুদ খেলে স্ট্রোকের সম্ভাবনাও অনেকখানি কমে যায়।


৪. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখতে :

টাইপ ২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখে কাঁচা হলুদ। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রনে রাখতে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল হলুদ। গবেষণায় দেখা গেছে যারা প্রতিদিন সকালে খালি পেটে কাঁচা হলুদ খেয়ে থাকেন, তাদের দেহের ভিতরে এমন কিছু উপাদানের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে যার প্রভাবে ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রনে চলে আসে। 

হলুদে থাকা কারকিউমিন অ্যান্টি ডায়াবেটিক উপাদান হিসাবে কাজ করে। এই কারকিউমিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম করার পাশাপাশি রক্তের মধ্যে উপস্থিত ফ্যাট বা চর্বির পরিমাণকেও নিয়ন্ত্রনে রাখে। এটি অগ্নাশয়ের বিটা সেল গুলির কার্যকারিতাকে উন্নত করে ইনসুলিন তৈরি করে যা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রনে রাখে।


৫. ওজন কমাতে সাহায্য :

বর্তমান সময়ে দেহের অতিরিক্ত ওজন নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেকেই সমস্যায় রয়েছেন। তবে সামান্য পরিমান হলুদ দৈনন্দিন গ্রহনের ফলে আপনি আপনার ওজনকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারেন। কাঁচা হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টি ওবেসিটি উপাদান গুলো শরীরে বাড়তি মেদ জমতে দেয় না এবং দেহের মেটাবলিজমের হার বাড়িয়ে দেয়। হলুদের মধ্যে থাকা কারকিউমিন শরীরে ফ্যাট সংরক্ষণকারী কোষ গুলির উৎপাদনে বাঁধা সৃষ্টি করে এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যথাযথ ডায়েট এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন কম করার পাশাপাশি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় হলুদ রাখা অত্যন্ত জরুরি।


৬. হজম ক্ষমতার বৃদ্ধি :

হজম ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটাতে সাহায্য করে কাঁচা হলুদ। গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত কাঁচা হলুদ খায় তাদের ক্ষেত্রে হজমে সহায়ক পাচক রসের সমস্যা কমে যায়। সেই সঙ্গে গ্যাস, অম্বল এবং অ্যাসিডিটির মতো সমস্যাও কমতে থাকে। এছাড়াও হলুদ হজমের উন্নতি ঘটিয়ে প্রদাহজনিত পেটের রোগ এবং ডায়ারিয়ার সমস্যা সমাধান করতে পারে। হলুদের মধ্যে থাকা উপাদানগুলি গ্যাস্ট্রিক আলসারের প্রভাব কম করতে পারে। তাই হজম ক্ষমতার উন্নতি করতে চাইলে আপনার নিয়মিত কাঁচা হলুদ খাওয়া অবশ্যই দরকার।


৭. ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধে :

মারণ রোগ ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে হলুদ। কোলন, পেট এবং ত্বকের ক্যান্সারের মতো রোগ নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে হলুদ। এর মধ্যে থাকা প্রতিরক্ষামূলক উপাদান গুলো ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কম করতে পারে এবং ক্যান্সারের বিস্তারকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা দৈনিক কাঁচা হলুদ খান তাদের বিভিন্ন রকম ক্যান্সার হওয়া অনেকটা কমে যায়। এছাড়াও ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করে শরীরকে সুস্থ রাখতে পারে হলুদ। হলুদের মধ্যে থাকা কারকিউমিন যেকোনো প্রদাহের সঙ্গে লড়াই করে শরীরকে প্রদাহমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।


৮. বাতের ব্যথা কমাতে :

যেকোনো ধরনের ব্যথা কমাতে হলুদের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বাতের ব্যথা, হাঁটুর ব্যথা যেকোনো ধরনের পেশির ব্যথার ক্ষেত্রে হলুদের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টি ইনফ্লেইমেটরি বা বিরোধী প্রদাহজনক উপাদানগুলো শরীরের ভেতর থেকে ব্যথা নিরাময়ে সহায়তা করে। এছাড়াও আর্থারাইটিস এবং হৃদযন্ত্রের সমস্যায় যারা ভুগছেন তাদের ক্ষেত্রে হলুদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। হলুদ রক্তে অক্সিজেন প্রেরন করে যা শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে এবং শরীরে যেখানে যেখানে ব্যথার সৃষ্টি হয় সেখানে সঠিক রক্ত সঞ্চালনের ফলে যেকোনো ব্যথা বা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলির সমাধান হয়।


৯. সর্দিকাশি প্রকোপ কমাতে : 

সর্দিকাশির প্রকোপ কমিয়ে নিরাময়ে সাহায্য করে হলুদ। বর্তমানে ঋতু পরিবর্তনের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হল সর্দিকাশি। ছোটো থেকে বড় ঘরের প্রায় সব সদস্যেরই এই সমস্যা লেগেই থাকে। কারও কারও আবার অ্যালার্জির কারনে বা জ্বরের মতো সমস্যার কারনে সর্দি হয়েই থাকে। তবে এই সমস্যা থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায় হলুদের সহায়তায়। হলুদ সর্দিকাশি কমাতে সাহায্য করে। 

এছাড়াও কাঁচা হলুদ অনাক্রম্যতা বা দেহের ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে যা সর্দি কাশির মতো রোগগুলিকে দূরে রাখে। কাঁচা হলুদে থাকা ভিটামিন সি সর্দিকাশি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া হাঁপানি এবং ব্রঙ্কাইটিসের মতো শ্বাসজনিত রোগগুলি কমাতে সাহায্য করে কাঁচা হলুদ। তাই নিজেকে সর্দিকাশি থেকে মুক্ত রাখার জন্য সকালে খালি পেটে কাঁচা হলুদ খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন।


১০. শরীরে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট বৃদ্ধি :

শরীরে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে কাঁচা হলুদ। যা শরীরকে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। মুলত মেয়েদের ক্ষেত্রে অ্যানিমিয়া হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাই মেয়েদের অবশ্যই প্রতিদিন কাঁচা হলুদ খাওয়া প্রয়োজনীয়। এছাড়া হলুদ লোহিত রক্তকণিকাকে রক্ষা করে এবং দেহের আয়রনের ঘাটতি মেটায়। 


উপরের কাঁচা হলুদের দশটি উপকারিতা ছাড়াও কাঁচা হলুদ আরও বহু উপকার করে আমাদের। প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক হিসাবে কাজ করে হলুদ। হলুদের মধ্যে থাকা অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্য যেকোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে সহজে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই বিভিন্ন পেটের রোগ এবং ত্বকের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও হলুদের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য