কলকাতার রাস্তায় স্ট্রিট ফুড হিসাবে যে দশটি খাবার খুব জনপ্রিয়

কলকাতা সিটি অফ জয় বা আনন্দের শহর কলকাতা এবং তার সঙ্গে আছে খাওয়া দাওয়া। হ্যাঁ কলকাতাকে যদি আমরা স্ট্রিট ফুডের শহর বলি তাহলেও হয়ত অত্যুক্তি করা হয় না। কারন শহরের এপ্রান্ত থেকে অপ্রান্তে রাস্তার ধারে বিভিন্ন রকমের খাবারের ছড়াছড়ি। চাইনিজ, মোগলাই থেকে সাউথ ইন্ডিয়ান অথবা অকৃত্রিম বাঙালিয়ানা খাদ্য কি নেই সেই খাদ্যের সম্ভারে। 


কলকাতার রাস্তায় স্ট্রিট ফুড হিসাবে যে দশটি খাবার খুব জনপ্রিয়


এমনকি ক্ষণে ক্ষণে, মরসুমের সঙ্গে সঙ্গে এই খাদ্যের রূপেও হয় পরিবর্তন। যেমন ধরুন গরম কালে যদি বেশিরভাগ জায়গায় পাওয়া যায় লস্যি বা আমের সরবত অথবা মিষ্টি দোকানের ঠাণ্ডা দই, সেখানেই শীতকালে পাওয়া যাবে নলেন গুড়, সন্দেশ ও মোয়া। কোথাও আবার মিলবে গাজরের হালুয়া সহ নানা প্রকার পীঠে পুলি। প্রচণ্ড বর্ষার বৃষ্টির মরসুমেই এখানে আয়োজিত হয় ইলিস উৎসব। তাই বলা যায় কলকাতায় প্রতি মরসুমে খাদ্যের ও এক একটা নতুন রূপ ফুটে ওঠে।

কলকাতার খাদ্য সম্ভারের কথা তো অনেক হল। এমন কিছু খাবার থাকেই যেগুলির ক্ষেত্রে মরসুম কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না অর্থাৎ প্রায় সবসময়ই জনপ্রিয়। তাহলে চলুন আজকে জেনে ফেলি এরকমই দশটি জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডের কথা যার মধ্যে কোনো না কোনো খাবার কখনো না কখনো সময় আপনি কলকাতার রাস্তায় দাড়িয়ে খেয়েছেন।

১. রোল
               রোল নামটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ময়দার নরম লেচির ভাজা পরোটার মধ্যে টুকরো টুকরো চিকেন অথবা ডিমের সঙ্গে ভাজা পরোটার মধ্যে কিছু আলুর পুর। তার উপর পেঁয়াজ কুচি ও অন্যান্য আনুসাঙ্গিক খাদ্যবস্তু। রোল তা সে চিকেন, মটন ই হোক বা ডিম বা পনির হোক কলকাতা বাসির কাছে এক রকম নস্টালজিয়া। স্ট্রিট ফুড হিসাবে কলকাতার রাস্তায় সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খাবারটি। খুব সহজে তৈরি এবং টিফিনের পক্ষে যথোপযুক্ত এই খাদ্যটির বিভিন্ন ধরন আমরা এখন দেখতে পাই, যেমন- চিকেন বা মটন রোল, পনির রোল, কাঠি রোল, কাবাব রোল, ভেজ রোল, টিকিয়া রোল ইত্যাদি।

২. চাউমিন
                কলকাতায় থেকে চাউমিন খায়নি বা নাম শোনেনি এমন মানুষ বোধয় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আদতে চাইনিজ বংশোদ্ভূত এই খাবারটি কলকাতার বিভিন্ন রাস্তার স্টলে পাওয়া যায়। ভোজনপ্রিয় বাঙালি এই খাওয়ারটিতেও দিয়েছে নিজস্ব ঘরানার স্টাইল এবং ফলে এর স্বাদেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। এগ এবং চিকেন চাউমিন তো পাবেনই তাছাড়াও আছে প্রন চাউমিন, ভেজ চাউমিন, এগ চিকেন মিক্সড চাউ, পনির চাউ, হাক্কা নুডলস, সেজোয়ান নুডলস আরও কত ধরন। মুখরোচক এই খাবারটি বিকালে অথবা সন্ধ্যার জলখাবার হিসাবে ব্যবহার করেন অনেকে আবার অনেকে এটিকে দুপুরের খাবার এবং কখনো রাতের খাবার হিসাবেও খেয়ে থাকেন।

৩. মোমো
              তিব্বতে জন্ম হলেও বর্তমানে কলকাতার একটি স্ট্রিট ফুড হিসাবে মোমো খুবই জনপ্রিয়। খাদ্যপ্রিয় বাঙালিরা খুব সহজেই এটিকে আপন করে নিয়েছে। নিরামিশ এবং আমিষ দুধরনের খাদ্য রসিকদের আকর্ষণ করে মোমো। গরম গরম সুপ এবং মিষ্টি ও ঝাল সসের সঙ্গে পরিবেশন করা, ভেজ বা চিকেনের পুর দেওয়া সিদ্ধ মোমো ছাড়াও প্যান ফ্রায়েড মোমোও কলকাতার রাস্তায় বেশ জনপ্রিয়।

৪. ফুচকা
               শুধু কলকাতার রাস্তাতেই বা কেন বলি এই গোলাকার সুখাদ্যটি ভারতের প্রায় সবস্থানেই পাওয়া যায়। আর যদি কলকাতার কথাই বলা হয় তাহলে শহরে, মফস্বলে, শহরতলির আশেপাশে এমন কোনো জনপ্রিয় মোড় হয়ত নেই যেখানে কোনো ফুচকা স্টল নেই। গোলাকার মুচমুচে পাপড়ির মধ্যে সিদ্ধ আলুর মশলাযুক্ত পুর তেঁতুল জলের সঙ্গে পরিবেশিত এই সুখাদ্যের কোনো তুলনা নেই। কোথাও আবার মেলে দই-ফুচকা যা টক দই দিয়ে পরিবেশিত হয়। এছাড়াও স্থানভেদে ফুচকার রকমভেদ দেখা যায়। ফুচকার নামেই জিভে জল এসে যায় ফুচকাপ্রেমীদের। 

৫. কচুরি ও তরকারি
             কলকাতার আপামর বাঙালির ব্রেকফাস্ট হিসাবে বলা যেতে পারে কচুরি ও তরকারির নাম। আরও ভালভাবে বললে হিং এর কচুরি এর মধ্যে আলাদাই একটা জায়গা ধরে রাখে। শালপাতার ঠোঙায় গরম গরম হিং এর কচুরি ও সুস্বাদু আলুর তরকারি, কলকাতার এক ঐতিহ্যই বটে। শীতের মরসুমে আবার সাধারন কচুরির জায়গা দখল করে কড়াইশুঁটির কচুরি যা অত্যন্ত উপাদেও।

৬. বিরিয়ানি
               বিরিয়ানি খেতে কে না ভালোবাসে, বিশেষ করে কলকাতাবাসী বাঙালিরা। মোগল সাম্রাজ্যের হাত ধরে আসা এই সুস্বাদু পদটির নিজস্ব একটি কলকাতা স্টাইল আছে। যার জন্য কলকাতায় একে কলকাতা বিরিয়ানি নামেও ডাকা হয়। বিগত কয়েক বছর ধরে স্ট্রিট ফুড হিসাবে কলকাতায় অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শুধু রেস্টুরেন্টে সীমাবদ্ধ না থেকে রাস্তার ধারেও প্রচুর বিরিয়ানির স্টল গড়ে উঠেছে। মুলত বাসমতী চাল ও চিকেন অথবা মটনকে একসাথে বিভিন্ন মশলা সহযোগে সুগন্ধি ও সুস্বাদু বিরিয়ানি তৈরি হয়। এই বিরিয়ানির সঙ্গে যোগ করা হয় সিদ্ধ আলু ও ডিম অনেকটাই কলকাতার বাঙালি ঘরানাকে প্রকাশ করে। কখনো ব্যবহার করা হয় টক দই দিয়ে তৈরি রায়তা। কলকাতায় বেড়াতে অবশ্যই এই উপাদেয়, সুস্বাদু ও সুগন্ধি কলকাতার বিরিয়ানি খেতেই হবে আপনাকে।

৭. তেলেভাজা, সিঙ্গারা
            আপনি যদি তেলেভাজা ও সিঙ্গারা খেতে ভালোবাসেন তবে কলকাতার রাস্তা আপনার জন্য স্বর্গের সমান। আলুর চপ সহ মুড়ি বাঙালির সন্ধ্যার আড্ডার মূল জলখাবার। শুধু আলুর চপ নয়, চিকেন চপ, এগ ডেভিল, সয়াবিন চপ, চিংড়ি মাছের চপ, ভেটকি ফিশ ফ্রাই, ডালবড়া, আমের চপ, মোচার চপ সঙ্গে কুচো পেঁয়াজ এবং শসার স্যালাড কি নেই কলকাতায়।

৮. ভেলপুরি ও ঝালমুড়ি
                ভেলপুরি ও ঝালমুড়ি দুটি খাদ্যের প্রধান উপাদান হল চাল থেকে তৈরি মুড়ি। দুটি ক্ষেত্রেই একাধিক বিভিন্ন রকম খাদ্য উপাদান মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয়। যেমন ঝালমুড়ি বা মশলা মুড়ির ক্ষেত্রে মুড়ির সঙ্গে চানাচুর, চিনে বাদাম, ঝুরি ভাজা, সিদ্ধ আলু, বিভিন্ন মশলা, টক আঁচার আরও বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়। ভেলপুরির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না, উপাদানের সামান্য হেরফের। ভিন্ন স্বাদে স্ট্রিট ফুড হিসাবে কলকাতায় বেশ জনপ্রিয়।

৯. ইডলি ও মশলা ধোসা
                সাউথ ইন্ডিয়ার জনপ্রিয় এই খাবারটি কলকাতার রাস্তায় দেদার বিক্রি হয়। সিদ্ধ চালের থেকে প্রস্তুত ইডলির তুলনা কিছুটা বাঙালির ভাপা পিঠের সঙ্গে করা চলে। ইডলির সঙ্গে টক সাম্বর ও নারকেলের চাটনি সহ পরিবেশন করা হয়। মশলা ধোসার মধ্যে থাকে উপাদেও আলু ও সবজি মিশ্রিত পুর, এটিও সাম্বর ও নারকেল চাটনি সহযোগে পরিবেশন করা হয়। মশলা ধোসাও অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার হিসাবে কলকাতায় পাওয়া যায়।

১০. জিলিপি, রসগোল্লা ও অন্যান্য মিষ্টান্ন
                        উপরের সমস্ত খাবারের তালিকায় আমরা এতক্ষণ টক, ঝাল, মশলাদার এবং আরও নানা স্বাদের খাওয়ার কথা আলোচনা করলাম। তা বলে মিষ্টি প্রেমিকদের কথা ভুললে চলবে না তাই একদম শেষে চলে এলাম মিষ্টি নিয়ে। কলকাতার রাস্তায় অসংখ্য মিষ্টান্ন ভাণ্ডার রয়েছে এবং সেখানে পাওয়া যায় হরেক রকম মিষ্টি। সেরকমই কিছু জনপ্রিয় মিষ্টির মধ্যে হল কলকাতার রসগোল্লা। স্পঞ্জের মতো নরম তুলতুলে, নধর সাইজের, অসাধারন স্বাদের এই মিষ্টির কোনো তুলনা নেই। স্ট্রিট ফুড হিসাবে বিখ্যাত মিষ্টি জিলিপিও প্রায় সব কচুরির দোকানেই পাওয়া যায়। এছাড়াও কলকাতার ছানার রাবড়ি, মিস্টি দই, কাঁচাগোল্লাও খুব উপাদেও মিষ্টান্ন।

 
সবশেষে উপসংহারে বলা যেতে পারে কলকাতার স্ট্রিট ফুড বেঁধে রাখার ক্ষমতা হিসাবে দশ সংখ্যাটা যথেষ্ট ছোট। উপরের এই নামগুলো ছাড়াও আরও প্রচুর খাবার পুরো কলকাতা জুড়ে ছড়িয়ে আছে।বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে কিছু খাবার হল এইগুলো দইবড়া, কাটলেট, পকোড়া, লাচ্চা পরোটা, পেটাই পরোটা, রুমালি রুটি, তন্দুর রুটি, নান পরোটা, ঘুগনি, এগ টোষ্ট, তড়কা, চিকেন কাবাব, মোগলাই, পাওভাজি, আইসক্রিম, এছাড়াও বিভিন্ন রকমের সরবত আরও কত কি। খাদ্যপ্রেমিক হলে আপনাকে অবশ্যই কলকাতার এইসব খাবারের আইটেমগুলি খেতে হবে। কে বলতে পারে কখন আপনি এই শহরের প্রেমে পড়ে যাবেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য